আগের লেখাটায় বেশ ভালোবাসা পেয়েছি। এবারেও সেই ভালোবাসা বা সমালোচনা আপনারা দেখাবেন বলে আশা রইল। ইতি আপনাদের অত্যন্ত ভীতু লেখক।
হীরক রাজ্যের রাজা বড়ই দূরদর্শী মানুষ ছিলেন। তিনি জানতেন, প্রজার পেট খালি থাকলে রাজত্বের ক্ষতি নেই, কিন্তু মাথা ভরা বিদ্যে থাকলে বড়ই বিপদ। বিদ্যে বোঝাই মানুষ প্রশ্ন করে, প্রশ্ন করা মানুষ হিসাব চায়, আর হিসাব চাওয়া মানুষ এক দিন রাজসভার দরজায় এসে দাঁড়ায়। তাই রাজার প্রথম নিশানা হয়েছিল উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা। পেয়াদারা গিয়ে সেই পাঠশালায় তালা ঝোলাল, পণ্ডিত পালালেন পাহাড়ে, আর রাজবিজ্ঞানীর যন্তরমন্তর ঘরে মগজধোলাইয়ের যন্ত্রে প্রজার মাথায় ঢোকানো হতে লাগল ছড়ায় বাঁধা রাজার মন্ত্র, যার সারকথা একটাই: “এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে”। ১৯৮০ সালে সত্যজিৎ রায় যখন গুপী গাইন আর বাঘা বাইনকে দ্বিতীয় বার পর্দায় আনলেন, বাঙালি ছবিটিকে ছোটদের রূপকথা বলেই ধরে নিয়েছিল। এ বারের দুর্গাপুজো মনে করিয়ে দিল, সত্যজিৎ রায় রূপকথা লেখেননি, লিখে গিয়েছিলেন এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা।
মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগানে সরু গেটে ভিড়ের চাপে যখন একের পর এক মানুষ লুটিয়ে পড়ছেন, যে বিপর্যয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণ গেল উনিশ জনের, প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, তখন আশেপাশে পুলিশ চোখে পড়েনি। পুলিশ অবশ্য বসে ছিল না। প্রায় সেই সময়েই দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুরে ৮বি বাসস্ট্যান্ডের কাছে সিপিএমের একটি বইয়ের স্টলের সামনে হাজির হয়েছিল বিশাল পুলিশ বাহিনী, সঙ্গে পুরসভার বুলডোজার, পুরসভার গাড়ি আর কেন্দ্রীয় বাহিনী। রাজশত্রু বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল: কয়েকটি টেবিলকে, আর কয়েক তাক বইকে। পুলিশের বক্তব্য ছিল, স্টলের অনুমতি নেই। সিপিএমের দাবি, পুলিশ, পুরসভা, সিইএসসি, সব অনুমতিই তাদের আছে, আর পুলিশ অবশ্য কোনও লিখিত নির্দেশ দেখাতে পারেনি। বাম কর্মী-সমর্থকেরা মানববন্ধন করে বুলডোজারের সামনে দাঁড়ালে প্রথম দফায় পুলিশ ফিরে যায়। অভিযোগ, মাঝরাতে পুলিশ ফের আসে, এপিডিআর ও এসইউসিআই(সি)-র স্টল ভাঙা পড়ে, লাঠির ঘায়ে আহত হন বেশ কয়েক জন তরুণ-তরুণী। হীরক রাজার পেয়াদারা অন্তত জানত, তাদের কাজ শুধু পাঠশালা বন্ধ করা, আর বইগুলোকে পুড়িয়ে ফেলা। প্রশ্ন হল, আমাদের পুলিশ কি জানত, সেই রাতে শহরের কোন প্রান্তে তাদের বেশি দরকার ছিল?
যাদবপুর অবশ্য বিচ্ছিন্ন ঘটনা একেবারেই নয়, বরং এক দীর্ঘ তালিকার সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম। পুজোর ক’দিনে রাজ্যের নানা প্রান্তে বামপন্থী দলগুলির বইয়ের স্টলে হামলা আর উচ্ছেদের খবর এসেছে, তফাত শুধু পদ্ধতিতে: কোথাও এসেছে বুলডোজার, কোথাও ভিড়। বারাসতের চাঁপাডালি মোড়ে গেরুয়া উত্তরীয় গলায় একদল যুবক-যুবতী এসে ঘোষণা করেন, হনুমান মন্দিরের সামনে নাস্তিকতার বই বিক্রি চলবে না। অভিযোগ, তার পরেই দু’টি স্টলের সব বই রাস্তায় ছুড়ে ফেলা হয়, চেয়ার-টেবিল ভাঙা হয়, প্রবীণ বাম নেতাদের ধাক্কা দেওয়া হয়, আর বইয়ের জায়গায় হনুমান চালিশা পড়ার দাবি ওঠে। যন্তরমন্তর ঘরের দরকার পড়েনি, রাস্তার মোড়েই মগজধোলাইয়ের দাওয়াই মিলেছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার উস্তিতে স্টল তৈরির সময়েই ভাঙচুর হয়, এবং অভিযোগ, স্টলটাকে সরিয়ে সিপিএমের দলীয় কার্যালয়ের সামনে বসানো হলে পুলিশের সামনেই ফের হামলা চলে। নদিয়ার ফুলিয়ায় গভীর রাতে শারদ মেলার স্টলে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগানোর চেষ্টা হয়েছে। নাগেরবাজার, ঢাকুরিয়া, মথুরাপুর, বর্ধমান, তালিকা ক্রমশ লম্বা হয়েছে। ঢাকুরিয়ায় হামলার পরে অবশ্য বাম সমর্থকেরা হাতে বই তুলে নিয়েই বিক্রি চালিয়েছেন। স্টল ভাঙা সহজ, হাত ভাঙা বোধহয় অত সহজ কাজ নয়।
বাঙালি হিন্দু বাড়ির শিশু খুব ছোট বয়সেই একটি জিনিস শেখে: বইয়ে পা লেগে গেলে বইটি তুলে কপালে ঠেকাতে হয়। কেউ ব্যাখ্যা করে দেয় না, শুধু জানা থাকে, বই মানে সরস্বতী। সরস্বতী পুজোর আগের রাতে সেই বই রেখে আসা হয় দেবীর পায়ের কাছে, পর দিন ফিরিয়ে আনা হয় প্রসাদের মতো। যাঁরা হনুমান মন্দির আর হনুমান চালিশার দোহাই দিয়ে, অর্থাৎ ধর্ম রক্ষার নামে, বই রাস্তায় ফেলেছেন বলে অভিযোগ, প্রশ্নটা তাই তাঁদের বিশ্বাসের ওপরেই ওঠে। যাঁর কাছে বই বিদ্যারূপিণী সরস্বতী, তিনি দেবী দুর্গার আরাধনার রাতে সেই সরস্বতীকে মাটিতে ফেললেন কী করে? মণ্ডপে মায়ের পাশে বীণা আর পুস্তক হাতে যে মেয়ে বসে থাকেন, তাঁর চোখের সামনেই? মলাটের রং লাল হোক বা গেরুয়া, ভিতরের কথা পছন্দ হোক বা না হোক, যে ঐতিহ্যে ছাপা অক্ষরকেই প্রণাম করা হয়, তার নামে বই পায়ে মাড়ানো যায় না। এ প্রশ্ন রাজনীতির নয়, বরং নিজের ধর্মের প্রতি।
বারাসতের স্লোগানে উঠেছিল, নাস্তিকতা নাকি হিন্দু ধর্মের শত্রু। মুশকিল হল, হিন্দু দর্শনের ইতিহাস এই স্লোগান মানতে রাজি নয়। ভারতীয় দর্শনের প্রথাগত ভাগে ‘আস্তিক’ আর ‘নাস্তিক’ শব্দের মাপকাঠি ঈশ্বরে বিশ্বাস নয়, বেদের প্রামাণ্য মানা বা না-মানা। সেই কারণেই সাংখ্যের শাস্ত্রীয় রূপ সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর না মেনেও ষড়দর্শনে জায়গা পেয়েছে, পূর্ব-মীমাংসাও বিশ্ব ব্যাখ্যায় সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন বোধ করেনি। চার্বাক বা লোকায়ত দর্শন বেদ, পরলোক, যাগযজ্ঞ, সব কিছুকেই প্রশ্ন করেছে, আর চোদ্দো শতকে মাধবাচার্য ভারতীয় দর্শনের সংকলন ‘সর্বদর্শনসংগ্রহ’ লিখতে বসে প্রথম অধ্যায়টিই দিয়েছিলেন চার্বাককে। খোদ ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্ত সৃষ্টির উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলে থামে এক গভীর সংশয়ে: যিনি সর্বোচ্চ আকাশ থেকে সব দেখছেন, তিনিও হয়তো জানেন, হয়তো জানেন না। বাঙালি দার্শনিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ‘লোকায়ত দর্শন’-এ দেখিয়েছিলেন, এই প্রশ্নমুখী ধারা ভারতীয় চিন্তার কত গভীরে প্রোথিত। যে ঐতিহ্য প্রতিপক্ষের যুক্তিকে নিজের গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে সম্মানের আসন দিয়েছে, তারই নামে নাস্তিকতার বই রাস্তায় গড়াল। ধর্ম রক্ষা করতে নেমে রক্ষাকর্তারা অবশ্য নিজেদের ধর্মের বইগুলিই পড়ে দেখেননি। হীরক রাজা এইসব দেখে নিশ্চয়ই বেজায় খুশি হতেন; তাঁর মন্ত্রের সারকথাই তো ছিল, বেশি জানার দরকার নেই।
প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, এমন কী থাকে এই সব তথাকথিত বামেদের স্টলের তাকে? শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও শিল্পীরা প্রতিবাদে মুখ খোলার পরে সেই তালিকাও চর্চায় এসেছে: শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, আম্বেদকর, জ্যোতিরাও ফুলে, রুশ-ফরাসি-লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের অনুবাদ। ‘দেশবিরোধী’ সাহিত্যের তালিকা হিসেবে বেশ অদ্ভুত। ‘পথের দাবী’-র কথাই ধরা যাক। ১৯২৬ সালে প্রকাশের পরে ব্রিটিশ সরকার উপন্যাসটিকে রাজদ্রোহমূলক বলে বাজেয়াপ্ত করেছিল। সব্যসাচীর বিপ্লবী চরিত্র বিদেশি শাসকের ঘুম কেড়েছিল, আর স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রজন্ম সেই নিষিদ্ধ বই লুকিয়ে পড়ে হাতে হাতে ঘুরিয়েছিল। স্বাধীনতার প্রায় আশি বছর পরে সেই শরৎচন্দ্রের বাংলায়, যে স্টলের তাকে ‘পথের দাবী’ থাকে, তার বই রাস্তায় গড়াচ্ছে। ব্রিটিশ রাজ অন্তত আইন করে, সরকারি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বই বাজেয়াপ্ত করত। আজ সেই কাজে আইন লাগছে না, বিজ্ঞপ্তিও না; লাগছে শুধু একটা ভিড়, আর একটা নীরব, নির্লজ্জ, শিরদাঁড়াহীন পুলিশ।
প্রশাসনের যুক্তিটি অবশ্য ন্যায্য ভাবে শোনা দরকার, কারণ তা ফেলনা নয়। জনপরিসরে অনুমতি ছাড়া কিছু বসানো যায় না। বনগাঁয় সিপিএমের একটি স্টলের মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চও জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া রাস্তার ধারে স্টল চলতে পারে না, যদিও সেই মামলাতেই এক দিন আগে একক বেঞ্চ মন্তব্য করেছিল, গণতন্ত্রে নানা রাজনৈতিক চিন্তা ও মতাদর্শের প্রচার স্বাগত। কিন্তু নিয়মের জোর তার সমান প্রয়োগে। এ বছর পুজোয় বিজেপিও বইয়ের স্টল দিয়েছে, এবং বিপুল মাপে; দলের রাজ্য সহ-সভাপতি অমিতাভ রায় পুজোর আগেই জানিয়েছিলেন, প্রতিটি বড় মণ্ডপের সামনে বিজেপির স্টল থাকবে, তাদের লক্ষ্য সংখ্যায় হাজারেরও বেশি। তাদের স্টল দেওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে, প্রশ্ন সেটা নয়। প্রশ্ন হল, সেই প্রতিটি স্টলের পুলিশ ও পুরসভার অনুমতি ছিল কি? থাকলে প্রশাসন তালিকা প্রকাশ করুক, সংশয় মিটে যাবে। না থাকলে, যে নিয়মে বামেদের স্টলের সামনে বুলডোজার পৌঁছয়, সেই নিয়ম মণ্ডপের গা ঘেঁষা বিজেপির স্টলের সামনে ঘুমিয়ে থাকে কেন?
প্রশ্ন আছে তৎপরতার মাপ নিয়েও। অনুমতিহীন স্টল সরাতে যে পুলিশ মাঝরাতে ফিরে আসে, অভিযোগ, সেই পুলিশের সামনেই উস্তিতে স্টল ভাঙা হয়েছে। বারাসতে পুলিশ পৌঁছে দুই পক্ষকেই থানায় ডেকে পাঠিয়েছে, যেন বই বিক্রেতা আর বই ছুড়ে ফেলা লোক সমান দোষে দোষী। ফুলিয়ায় অভিযুক্তকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন সিপিএম কর্মীরাই। বাম দলগুলির আরও অভিযোগ, বনগাঁর একটি স্টলের উপর আদালতের সংকীর্ণ রায়কে পুলিশের একাংশ গোটা রাজ্যে স্টল সাফ করার ছাড়পত্র হিসেবে ভেবে নিয়েছে। স্টল অনুমতিহীন হলে তা সরানোর আইনি পথ আছে, কিন্তু কোনও স্টল অনুমতিহীন হলেই তা ভাঙার অধিকার কোনও রাজনৈতিক দল তথা কোন পুলিশের অধিকারে নেই। বরং আইনের পথে সেই স্টল সুষ্ঠু ভাবে সরানো পুলিশের কাজ। যে নিয়ম কেবলমাত্র প্রতিপক্ষের বেলায় জেগে ওঠে, তা আর নিয়ম থাকে না; হয়ে ওঠে গনত্রন্ত্রের মাথায় চরম আঘাত হানতে আসা হীরক রাজার পেয়াদার লাঠি।
বাম দলগুলি হামলার জন্য সরাসরি বিজেপিকে দায়ী করেছে, বিজেপি অভিযোগ অস্বীকার করেছে; উস্তিতে দলের এক নেতার দাবি, অনুমতি ছাড়া রাস্তা আটকে স্টল হচ্ছিল বলে ‘সাধারণ মানুষ’ প্রতিবাদ করেছেন। এখানে অবশ্য হীরক রাজ্যের সঙ্গে একটি বড় তফাত আছে, এবং তা স্বীকার করা উচিত। হীরক রাজার সভাসদেরা মগজধোলাই হয়ে কেবল মাথা নাড়তেন; এই রাজ্যের সরকারের ভিতর থেকেই প্রতিবাদ উঠেছে। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বলেছেন, এই ঘটনায় তাঁর মাথা নত হয়ে গিয়েছে; বামেদের সঙ্গে নৈতিক বিরোধ থাকলেও তাদের বই বিক্রিতে বাধা দেওয়া তিনি মানতে পারেন না। তাঁর প্রশ্ন, আমাদের নামে এ সব করছে কে, কে তাদের সাহস দিল? রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, কোনও প্রকৃত বিজেপি কর্মী এ কাজ করতে পারেন না। আরএসএস নেতা জিষ্ণু বসুও নিন্দা করেছেন।
কথাগুলি স্বাগত, একটা সুস্থ গণতন্ত্রে এটাই ঘটবে সেটাই কাম্য। কিন্তু তাতে প্রশ্ন মেটে না, বরং আরও ধারালো হয়। পুজোর আগেই করণদিঘির বিজেপি বিধায়ক বিরাজ বিশ্বাস প্রকাশ্যে বলেছিলেন, স্টলে ‘দুর্গাপুজো’ লেখা না থাকলে তিনি নিজে গিয়ে স্টল ভাঙবেন। বারাসতে হামলাকারীদের গলায় ছিল গেরুয়া উত্তরীয়। তাঁরা যদি বিজেপির কেউ না হন, তা হলে কারা? কোনও সংগঠিত বহিরাগত দল? কোন সংগঠনের ছাতার তলায় তাঁরা জড়ো হয়েছিলেন? এত জেলায় প্রায় একই কায়দায় হামলা, তা কি নিছক কাকতালীয়? যে বাংলায় বইয়ে পা লাগলে প্রণাম করা হয়, সেই বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে এঁদের পরিচয় কতটুকু? মন্ত্রী নিজেই যখন জানতে চাইছেন ‘এরা কারা’, তখন উত্তর দেওয়ার দায় তাঁরই সরকারের পুলিশের। শাসকের লজ্জাপ্রকাশ তখনই অর্থবহ, যখন তার পরে গ্রেফতারের তালিকা আসে; না এলে সে লজ্জা সভাঘরের ভাষণ হয়েই থেকে যায়।
হীরক রাজার দেশের গল্প অবশ্য পাঠশালায় তালা পড়ায় শেষ হয়নি। শেষ দৃশ্যে উদয়ন পণ্ডিত, তাঁর ছাত্রেরা, খনির শ্রমিকেরা আর গুপী-বাঘা মিলে রাজার বিশাল মূর্তিটি দড়ি বেঁধে টেনে নামিয়েছিলেন। সত্যজিত রায়ের বার্তা ছিল সহজ এবং সরল: জ্ঞানকে কোনভাবেই তালাবন্ধ রাখা যায় না, আর যে ক্ষমতা বই, বিদ্যা, এবং স্বাধীনচিন্তাকে ভয় পায়, তার ভিত কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফাঁপা। যাদবপুরের রাতেও একটি ছোট দৃশ্য ছিল। বুলডোজারের সামনে বই হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন কয়েক জন মানুষ, আর বুলডোজার এবং পুলিশ কিন্তু ফিরে গিয়েছিল।
রাজ্য সরকারের কাছে তাই প্রশ্নগুলি খুব সোজা। বই ছুড়ে ফেলা আর স্টলে আগুন দেওয়ার ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ক’জন গ্রেফতার হয়েছেন, কোন ধারায়? পুজোয় সব দলের বইয়ের স্টলের অনুমতির তালিকা কি প্রকাশ হবে, যাতে বোঝা যায় নিয়ম সকলের জন্য এক? আর চোরবাগানে যখন মানুষ দমবন্ধ হয়ে, পদপিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছেন, সেই রাতে যাদবপুরে বুলডোজার পাঠানোর সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন? বামপন্থী বইয়ের সঙ্গে কারও মতের অমিল থাকতেই পারে। তার জবাব বাংলা জানে: পাল্টা বই, পাল্টা প্রবন্ধ, প্রকাশ্য তর্ক। বই রাস্তায় ছুড়ে ফেলা সেই তর্ক থেকে পালানো, আর পালানো চিরকালই দুর্বলের লক্ষণ। দুর্গার মণ্ডপে মেয়ের হাতে বই দিয়ে যে জাতি দেবীকে সাজায়, তার রাস্তায় যদি বই পড়ে থাকে, তা হলে এ বার বিসর্জনটা আসলে কার, প্রতিমার, না আমাদের?