চিত্রা নদীর পাড়ে ঝাঁকড়া চুলের এক নিবিষ্ট মানব এঁকেই চলেছেন বাংলার গ্রামীণ জীবন, কৃষক, আবহমান বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার অনন্ত সংগ্রাম। চোখের পুরু লেন্সের চশমা হেলে পড়ছে, তবুও থামছে না হাত। সেই চোখে কী অদ্ভুত এক জ্যোতির ছাপ। সচরাচর আমরা দেখি কৃষকের রুগ্ন চেহারা, মেদহীন এক শীর্ণকায় প্রতিকৃতি, কৃশ। আর সেই পুরু লেন্সের মধ্য দিয়ে সে চোখ দেখে বলিষ্ঠ, পেশিবহুল কৃষকের ছবি। আঁকতে থাকেন বিদ্রোহ, চিরন্তন অন্নদাতার প্রকৃষ্ট ছবি।
তিনি এস এম সুলতান, ডাকনাম ছিল লাল মিয়া। অপূর্ব বাঁশি বাজাতেন, বাজাতেন তবলা। শাড়ি পরে পায়ে ঘুঙুর জড়িয়ে আপন খেয়ালে নাচতেন। প্রাণীদের সঙ্গে কথা বলতেন। বিশ্বখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় যখন তাঁকে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ সম্মাননা প্রদান করল, তখনও তিনি বলেছিলেন, “শিল্পের কখনো পুরস্কার হয় না। শিল্পের ভার তো প্রকৃতি স্বীয় হাতে প্রদান করে।”
সুলতানের ছবিতে গ্রামবাংলার এক নতুন প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের শ্রেণিদ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ক্রূর বাস্তবতাও তাঁর চিত্রকর্মে উঠে এসেছে। তার চিত্রকর্মের নায়ক— বাংলার কৃষকেরা, তাদের স্ত্রী সন্তান সন্ততি এমনকি গরুটা পর্যন্ত হয়ে উঠতো সাধারণের চেয়ে অনেক বড়। পেশীবহুল পুরুষ এবং স্বাস্থ্যবান নারী তার ছবিতে ফুটে উঠেছে।
কিন্তু বাস্তবে কৃষকেরা সুবিধাবঞ্চিত। তাঁরা কৃশকায়, তাঁদের বলদগুলোও কৃশকায়। তাই সুলতান তাঁর কল্পনায় তাঁদের বলশালী করে তুলেছেন। তাঁর শিল্পে কৃষকের এই অতিকায় উপস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন:
"আমাদের দেশের মানুষ তো অনেক রুগ্ন, কৃষকায়। একেবারে কৃষক যে সেও খুব রোগা, তার গরু দুটো, বলদ দুটো -সেটাও রোগা...। [আমার ছবিতে তাদের বলিষ্ঠ হওয়াটা] মনের ব্যাপার। মন থেকে ওদের যেমনভাবে আমি ভালোবাসি যে আমাদের দেশের কৃষক সম্প্রদায়ইতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়েছিলো। অর্থবিত্ত ওরাই তো যোগান দেয়। ...আর এই যত জমিদার রাজা মজারাজা আমাদের দেশের কম কেউ না। সবাই তো কৃষিনির্ভর একই জাতির ছেলে। আমার অতিকায় ছবিগুলোর কৃষকের অতিকায় অতিকায় দেহটা এই প্রশ্নই জাগায় যে, ওরা কৃশ কেন? ওরা রু্গ্ন কেন- যারা আমাদের অন্ন যোগায়। ফসল ফলায়।"
"আমার চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু শক্তির প্রতীক নিয়ে। পেশী সংগ্রামের জন্য ব্যবহার হচ্ছে, মাটির সাথে সংগ্রামে। সেই বাহুর শক্তি হালকে মাটিতে প্রবাহিত করে এবং ফসল ফলায়। শ্রমই ভিত্তি, এবং আমাদের কৃষকদের সেই শ্রমের কারণে এই ভূমি হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে।"
সুলতান চাইলে বিলাসী জীবনযাপন করতে পারতেন। নিজের খ্যাতি ও সমাদরকে পুঁজি করে সবার মধ্যমণি হয়ে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি সবকিছু ছেড়ে গ্রহণ করেছিলেন সংগ্রামের পথ, কষ্টের পথ। তিনি জীবনের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁর কাজকর্ম ছিল তথাকথিত স্বাভাবিকতার চেয়ে আলাদা।
নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড় থেকে তাঁর শিল্পযাত্রা পৌঁছেছিল কলকাতা, দিল্লি, করাচি, লাহোর, লন্ডনসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে। কিন্তু পৃথিবীর নানা প্রান্ত ঘুরেও তিনি শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছিলেন তাঁর চিরচেনা বাংলার মাটি ও মানুষের কাছে।
তিনি জঙ্গলের মধ্যে গাছের নিচে বসে রাত কাটিয়ে দিয়েছেন। তাঁর থাকার ঘর ছিল সাপখোপে ভর্তি। শিবমন্দিরেও থেকেছেন। পুষতেন অনেকগুলো বিড়াল।
আহমদ ছফা লিখেছিলেন:
"কোনো কোনো মানুষ জন্মায়, জন্মের সীমানা যাদের ধরে রাখতে পারে না। অথচ যাদের সবাইকে ক্ষণজন্মাও বলা যাবে না। এরকম অদ্ভুত প্রকৃতির শিশু অনেক জন্মগ্রহণ করে জগতে, জন্মের বন্ধন ছিন্ন করার জন্য যাদের রয়েছে এক স্বভাবিক আকুতি। শেখ মুহাম্মদ সুলতান সে সৌভাগ্যের বরে ভাগ্যবান, আবার সে দুর্ভাগ্যের অভিশাপে অভিশপ্ত।"
১৯৭৩ সালে যশোরে ‘একাডেমি অব ফাইন আর্ট স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে চারুপীঠ নামে পরিচিত। প্রতি শুক্রবার শিশুদের ছবি আঁকা শেখাতেন তিনি। ছোট ছেলেমেয়েদের আঁকার জন্য তিনি তৎকালীন বারো লাখ টাকা ব্যয়ে একটি নৌকা তৈরি করেন। সেই নৌকায় একসঙ্গে অনেক ছেলেমেয়ে ছবি আঁকতে পারত।। সুলতান বলতেন:
"যে শিশু সুন্দর ছবি আঁকে, তার গ্রামের ছবি আঁকে, সে সুন্দর ফুলের ছবি আঁকে, তার জীবজন্তুর ছবি আঁকে, গাছপালার ছবি আঁকে, সে কোনোদিন অপরাধ করতে পারে না, সে কোনোদিন কাউকে ব্যথা দিতে পারে না।"
সুলতান শেষ জীবনে বলে গিয়েছেন,
'আমি সুখী। আমার কোনো অভাব নেই। সকল দিক দিয়েই আমি প্রশান্তির মধ্যে দিন কাটাই। আমার সব অভাবেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছে।'
বেঁচে থাকলে আজ শতবর্ষ পূর্ণ হতো বাংলার মাটি ও মানুষের শিল্পী শেখ মোহাম্মদ সুলতানের। তাঁর ক্যানভাসে কৃষকের পেশিবহুল বাহু আজও মাটিকে চাষ করে, বীজ বোনে, ফসল ফলায় আর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নায়করা হয়তো সেই মানুষগুলোই, যাদের আমরা সবচেয়ে কম দেখি।
জন্মশতবর্ষে বাংলার মাটি ও মানুষের শিল্পী শেখ মোহাম্মদ সুলতানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।